মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের অনিশ্চয়তার কারণে ২০২৭ সালে বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি পরিকল্পনায় পরিবর্তন এসেছে। আগামী বছরের চুক্তিবদ্ধ ৪০টি কার্গোর মধ্যে ২৬টি সরবরাহ করবে কাতারএনার্জি। এদিকে ওমান গ্যাস সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি করায় এবং জেকেএম মূল্য নির্ধারণের শর্ত দেওয়ায় সরকার আপাতত আগামী মার্চ পর্যন্ত আমদানি সূচি চূড়ান্ত করেছে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পয়েন্ট (Key Takeaways):
- ২০২৭ সালের জন্য চুক্তিবদ্ধ ৪০টি এলএনজি কার্গোর মধ্যে ২৬টি সরবরাহ করবে মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষ জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি, যা মোট চাহিদার ৬৫ শতাংশ।
- ওমানের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ওকিউ ট্রেডিং (ওকিউটি) নির্ধারিত ৩২টি কার্গোর বিপরীতে একটিও নিশ্চিত করেনি এবং ব্রেন্ট সূচকের পরিবর্তে জেকেএম মার্কার ভিত্তিতে দাম নির্ধারণের শর্ত দিয়েছে।
- দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে সরবরাহ ঘাটতি ও স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কেনার ফলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই খাতে ভর্তুকি ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
সম্পূর্ণ প্রতিবেদন
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের অনিশ্চয়তার কারণে ২০২৭ সালে বাংলাদেশের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে। আগামী বছরের জন্য পূর্বনির্ধারিত চুক্তিবদ্ধ ৪০টি এলএনজি কার্গোর মধ্যে ২৬টি সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি জায়ান্ট কাতারএনার্জি। এর ফলে কাতার একা থেকেই মোট চাহিদার প্রায় ৬৫ শতাংশ গ্যাস সরবরাহের দায়িত্ব নিচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় অন্যান্য আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীর কাছ থেকে গ্যাস প্রাপ্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় পুরো বছরের পরিবর্তে আপাতত আগামী মার্চ মাস পর্যন্ত আমদানি সূচি চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির নির্দেশনা অনুযায়ী পেট্রোবাংলাকে এই সংক্ষিপ্ত মেয়াদের সূচি তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ সালে প্রাথমিকভাবে প্রায় ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা করা হয়েছিল, যার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় ১০৩টি কার্গো পাওয়ার কথা ছিল। মোট ১২৮টি চুক্তিবদ্ধ কার্গোর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৭১টির সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। কাতারএনার্জির সহযোগী প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি ট্রেডিং এলএলসি ২৪টি কার্গোর বিপরীতে ১৮টি সরবরাহের কথা জানিয়েছে। অর্থাৎ দুই প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে কাতার থেকে মোট ৪৪টি কার্গো আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এর বিপরীতে ওমানের ওকিউ ট্রেডিং ৩২টি কার্গো সরবরাহের কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত একটিও নিশ্চিত করেনি। উল্টো তারা ১৬টি কার্গো দেওয়ার প্রস্তাবের পাশাপাশি প্রচলিত ব্রেন্ট সূচকভিত্তিক মূল্য কাঠামোর পরিবর্তে জাপান-কোরিয়া মার্কার (জেকেএম) ভিত্তিতে দাম নির্ধারণের নতুন শর্ত জুড়ে দিয়েছে, যা পেট্রোবাংলা ইতোমধ্যে প্রত্যাখ্যান করেছে।
এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় সরবরাহকারীদের মধ্যে গানভর ইউএসএ ছয়টি এবং ফ্রান্সের টোটালএনার্জিস ১২টি কার্গো সরবরাহ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের এক্সেলেরেট এনার্জির নির্ধারিত ১৪টি কার্গোর মধ্যে নয়টির সরবরাহ ইতিমধ্যে নিশ্চিত হয়েছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালিতে সামুদ্রিক চলাচলের ঝুঁকি এড়াতেই সরকার আপাতত নমনীয় বা সংক্ষিপ্ত মেয়াদের আমদানি কৌশল গ্রহণ করেছে। সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের প্রত্যাশা, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বাড়তি কার্গো সংগ্রহ করা তুলনামূলক সহজ হবে।
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে ধারাবাহিক সরবরাহ ঘাটতি দেখা দেওয়ায় বাংলাদেশকে বাধ্য হয়ে চড়া দামে স্পট মার্কেট বা মুক্তবাজার থেকে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। এর ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে এবং সরকারের জ্বালানি ভর্তুকি খাতে মারাত্মক আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই এলএনজি আমদানির ভর্তুকি বাবদ সরকারের ব্যয় হয়েছে ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের গতিপ্রকৃতি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ পরিস্থিতির সার্বিক উন্নতি সাপেক্ষে পেট্রোবাংলা পরবর্তী সময়ে তাদের বার্ষিক আমদানি পরিকল্পনা পুনর্নির্ধারণ করবে বলে জানিয়েছে।
বাংলা নিউজ ২৪ জাতীয় সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুসারে বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর সংবাদ প্রকাশ করে। কোনো অসঙ্গতি বা তথ্য সংশোধনের জন্য আমাদের সম্পাদকীয় বিভাগের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ করা হচ্ছে।