পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের কাঞ্চননগরে দামোদর নদের গর্ভ থেকে ১৯১৬ সালের ভয়াবহ বন্যার পর উদ্ধার হয় ছয় ফুট উচ্চতার কষ্টিপাথরের কঙ্কালেশ্বরী কালী মূর্তি। কালো ব্যাসাল্ট পাথরে নিখুঁতভাবে খোদাই করা এই অষ্টভুজা চামুণ্ডা মূর্তিতে মানবদেহের শিরা-উপশিরা ও কঙ্কাল রূপ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে পাল বা জৈন যুগের এই প্রাচীন মূর্তিকে ঘিরে প্রতি বছর কালীপুজোয় নামে ভক্তদের ঢল।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পয়েন্ট (Key Takeaways):
- কঙ্কালেশ্বরী কালী মূর্তিটি ছয় ফুট উঁচু এবং এটি খাঁটি কালো ব্যাসাল্ট বা কষ্টিপাথরে অত্যন্ত নিপুণভাবে খোদাই করা হয়েছে।
- ১৯১৬ সালের ঐতিহাসিক দামোদরের বন্যার পর নদীর গর্ভ থেকে এই বিরল মূর্তিটি উদ্ধার করা হয়, যা বর্তমানে প্রায় আড়াইশো বছরের পুরনো মন্দিরে পূজিত হচ্ছে।
- মূর্তির গঠনশৈলীতে মানবদেহের কঙ্কালসার রূপ ও শিরা-ধমনী নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা পাল বা জৈন আমলের শিল্পকলার নিদর্শন বলে মনে করেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা।
সম্পূর্ণ প্রতিবেদন
পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার কাঞ্চননগরে অবস্থিত কঙ্কালেশ্বরী কালী মন্দির তার ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বের জন্য সারা বাংলায় সুপরিচিত। এখানকার প্রধান আকর্ষণ হলো ছয় ফুট উচ্চতার কষ্টিপাথরে নির্মিত দেবী মূর্তি, যা প্রথম দেখলেই এর ব্যতিক্রমী গঠনশৈলী ও কারুকার্যের জন্য নজর কাড়ে। অষ্টভুজা এই চামুণ্ডা মূর্তির গলায় রয়েছে মুণ্ডমালা, ডান হাতে ত্রিশূল এবং পায়ের নিচে শায়িত রয়েছেন মহাদেব। মূর্তির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মানবদেহের কঙ্কালসার রূপের নিখুঁত প্রকাশ, যেখানে শরীরের শিরা-উপশিরা ও ধমনীগুলো পাথরের বুকে স্পষ্ট ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
ইতিহাস ও লোকমুখে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯১৬ সালের আশপাশে বাংলায় এক প্রলয়ংকরী বন্যায় দামোদর নদের অববাহিকা প্লাবিত হয়েছিল। সেই সময় জলের তীব্র স্রোত ও ভাঙনের পর দামোদরের গর্ভ থেকেই কাদামাটি ভেদ করে উঠে আসে এই কষ্টিপাথরের দেবী মূর্তিটি। পরবর্তীতে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও ভক্তরা মিলে মূর্তিটি উদ্ধার করে বর্তমান স্থানে প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় আড়াইশো বছরের পুরনো এই মন্দিরের স্থাপত্যেও রয়েছে বিশেষত্ব, যার নয়টি চূড়াই সুদৃশ্য টেরাকোটার কারুকার্যে সমৃদ্ধ।
প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ইতিহাসবিদদের মতে, এই মূর্তির গঠনরীতি ও ভাস্কর্যশৈলী দেখে একে বৌদ্ধ বা পাল যুগের সময়কার বলে অনুমান করা হয়। কেউ কেউ আবার একে জৈন আমলের শিল্পকীর্তি বলেও দাবি করে থাকেন। প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি প্রাচীন হতে পারে এই মূর্তি—এমনটাও মনে করেন অনেক গবেষক। মূর্তিটির নিখুঁত অ্যানাটমিক্যাল বা শারীরস্থানিক নিখুঁত প্রকাশ প্রাচীন ভারতীয় ভাস্কর্য শিল্পের উৎকর্ষের এক অনন্য নিদর্শন বহন করে।
সারাবছরই বর্ধমানের এই কঙ্কালেশ্বরী মন্দিরে দেশ-বিদেশ থেকে বহু দর্শনার্থী ও ভক্তের সমাগম ঘটে। বিশেষ করে কালীপুজোর অমাবস্যা তিথিতে এখানে লক্ষাধিক ভক্তের সমাগম হয় এবং পূজা উপলক্ষে জমজমাট উৎসবের রূপ নেয়। ভক্তদের বিশ্বাস, কঙ্কালরূপিণী এই দেবীর কাছে মানত করলে সমস্ত মনস্কামনা পূর্ণ হয়, যা এই প্রাচীন ধর্মীয় ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটিকে বাংলার অন্যতম প্রধান আধ্যাত্মিক গন্তব্যে পরিণত করেছে।
বাংলা নিউজ ২৪ জাতীয় সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুসারে বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর সংবাদ প্রকাশ করে। কোনো অসঙ্গতি বা তথ্য সংশোধনের জন্য আমাদের সম্পাদকীয় বিভাগের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ করা হচ্ছে।