১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির ৩০ বছর মেয়াদ আগামী ১২ ডিসেম্বর শেষ হতে যাচ্ছে। চুক্তি নবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশের শুষ্ক মৌসুমে পানির তীব্র সংকট ও কৃষি বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফারাক্কা ব্যারাজের প্রভাবে পদ্মা অববাহিকার ৫ কোটিরও বেশি মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে। নতুন চুক্তির জন্য বাংলাদেশ আহ্বান জানালেও ভারত এখনো আনুষ্ঠানিক সাড়া দেয়নি।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পয়েন্ট (Key Takeaways):
- ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ১২ ডিসেম্বর ২০২৬ সালে শেষ হচ্ছে, যেখানে চুক্তির স্বয়ংক্রিয় নবায়নের কোনো শর্ত নেই এবং ভারত এখন পর্যন্ত নতুন আলোচনার আহ্বানে সাড়া দেয়নি।
- পানির অভাবে বাংলাদেশের বৃহত্তম গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের কার্যকারিতা ৯৫৫ বর্গকিলোমিটার থেকে কমে ৫৫০ বর্গকিলোমিটারে নেমে এসেছে, যা দেশের কৃষি ও বাস্তুসংস্থানের জন্য বড় হুমকি।
- পানির সংকট নিরসনে বাংলাদেশ ২.৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে, যার আওতায় ১১৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সম্পূর্ণ প্রতিবেদন
আগামী ১২ ডিসেম্বর ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির ৩০ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রাক্কালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার পানি কূটনীতিতে এক গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফারাক্কা ব্যারাজের মাধ্যমে পানি নিয়ন্ত্রণের ফলে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীতে পানির প্রবাহ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে, যা বাংলাদেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি ও জনজীবনে বিপর্যয় ডেকে আনছে। বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকরা পানির অভাবে ফসল উৎপাদন করতে না পেরে চরম অর্থনৈতিক সংকটের সম্মুখীন হচ্ছেন।
১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর থেকেই গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমে পানি বণ্টনের একটি কাঠামো তৈরি করা হলেও, বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন এবং উজানে অতিরিক্ত বাঁধ নির্মাণের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পরিবেশবাদী সংগঠন 'রিভারাইন পিপল'-এর তথ্যমতে, চুক্তিহীন বছরগুলোতে গড়াই নদীর মতো গুরুত্বপূর্ণ শাখা নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় সুন্দরবনের মিঠা পানির প্রবাহ ও লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে।
বাংলাদেশের পানি বণ্টন বিষয়ক টেকনিক্যাল কমিটির প্রধান রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, বাংলাদেশ পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সুবিধার ভিত্তিতে নতুন চুক্তির প্রত্যাশা করছে। তবে যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) সর্বশেষ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদদের মতে, চুক্তির নবায়ন না হলে বা নতুন কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে তা বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ পরিবেশগত ও মানবিক বিপর্যয় বয়ে আনতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মতো মেগা প্রকল্প হাতে নিলেও, আন্তঃসীমান্ত নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদী সমাধান কঠিন। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক ও বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এই চুক্তি নবায়নের প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে। এখন দেখার বিষয়, ডিসেম্বরের সময়সীমা পার হওয়ার আগেই দুই দেশ কোনো কার্যকর কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছাতে পারে কি না।
বাংলা নিউজ ২৪ জাতীয় সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুসারে বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর সংবাদ প্রকাশ করে। কোনো অসঙ্গতি বা তথ্য সংশোধনের জন্য আমাদের সম্পাদকীয় বিভাগের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ করা হচ্ছে।