জলপাইগুড়ির ঐতিহাসিক বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির ৫১৭তম দুর্গাপুজো শুরু হয়েছে মহালয়ার সন্ধ্যায় চক্ষুদানের মাধ্যমে। কালিকা পুরাণ মতে পরিচালিত এই প্রাচীন পুজোয় প্রথমে সোনার দুর্গা ও পরে মৃন্ময়ী প্রতিমার চক্ষুদান করা হয়। রাজা না থাকলেও জন্মাষ্টমীর কাঠামো পুজো ও দধি কাদো খেলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই আয়োজনে রয়েছে চালের মণ্ড দিয়ে প্রতীকী নরবলির অনন্য ঐতিহ্য।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পয়েন্ট (Key Takeaways):
- জলপাইগুড়ির বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির দুর্গাপুজো এ বছর ৫১৭ বছরে পদার্পণ করেছে, যা মহালয়ার সন্ধ্যায় চক্ষুদান পর্বের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।
- কালিকা পুরাণ মতে পরিচালিত এই পুজোয় প্রথমে সোনার দুর্গা এবং পরে মৃন্ময়ী প্রতিমার চক্ষুদান করা হয়, যেখানে রয়েছে চালের মণ্ড দিয়ে প্রতীকী নরবলি দেওয়ার প্রাচীন প্রথা।
- জন্মাষ্টমীর পরের দিন কাঠামো পুজো ও দধি কাদো খেলার মধ্য দিয়ে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয় এবং দশমীতে বন্দুকের শূন্যে গুলি ছুড়ে প্রতিমা নিরঞ্জনের সূচনা করা হয়।
সম্পূর্ণ প্রতিবেদন
জলপাইগুড়ির ঐতিহাসিক বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজো এবার ৫১৭ বছরে পা দিয়েছে। মহালয়ার পবিত্র সন্ধ্যায় দেবী দুর্গার চক্ষুদানের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে এই রাজপরিবারের শতাব্দীপ্রাচীন দুর্গাপুজো। পারিবারিক নিয়ম ও প্রাচীন প্রথা মেনে প্রথমে সোনার দুর্গার চক্ষুদান করা হয়, এরপর মৃন্ময়ী প্রতিমার চক্ষুদান সম্পন্ন হয়। রাজা ও রাজত্ব না থাকলেও জলপাইগুড়ির এই রাজবাড়ির দুর্গোৎসবে ভাটা পড়েনি এতটুকুও। শতাব্দীপ্রাচীন এই আরাধনা ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা লক্ষ করা যায়।
কালিকা পুরাণ মতে এই রাজবাড়িতে দুর্গোৎসব পরিচালিত হয়ে আসছে। প্রতিবছর জন্মাষ্টমীর পরের দিন কাঠামো পুজোর মাধ্যমে এই পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয়। প্রতিবছর নিরঞ্জনের পর প্রতিমার মূল কাঠামো জল থেকে তুলে রাজবাড়ির মণ্ডপে রাখা হয় এবং সেই কাঠামোটাই পরবর্তী বছর পুজোর জন্য ব্যবহৃত হয়। কাঠামোপুজোর পর নন্দোৎসব ও দধি কাদো খেলার মধ্য দিয়ে এলাকার কচিকাঁচাদের অংশগ্রহণে প্রতিমা তৈরির মাটি প্রস্তুত করা হয়। মনসা পুজোর পরের দিন থেকে শুরু হয় মূল প্রতিমা গড়ার কাজ। বৈকুণ্ঠপুর রাজপরিবারের দুর্গাপুজোর ইতিহাসে অতীতে নরবলির প্রচলন ছিল, যা বর্তমানে চালের মণ্ড দিয়ে মানুষের প্রতিকৃতি তৈরি করে প্রতীকি নরবলি দেওয়ার মাধ্যমে রক্ষা করা হচ্ছে। এছাড়া প্রতিমার গায়ের রঙ তপ্ত কাঞ্চন বর্ণা, যা সোনা গলালে যে রঙ ধারণ করে তার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
মহালয়ার দিন থেকেই শুরু হওয়া এই পুজোয় নবমীর দিন রাজবাড়িতে সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন গোটা শহরবাসী ও নারীরা। দশমীর দিন বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির প্রাচীন রীতি মেনে দেবীর পুজো শেষ হওয়ার পর দেবীকে সিঁদুর ছোঁয়াতে রাজবাড়ি চত্বরে উপচে পড়ে ভিড়। এরপর রাজপরিবারের সদস্য সৌম্য বসু বন্দুকে শূন্যে গুলি ছুড়ে রাজবাড়ির ভাসান পর্বের সূচনা করেন। শূন্যে গুলি ছোড়ার পর রাজবাড়ির নাটমন্দির সংলগ্ন পুকুরে ঐতিহ্যবাহী প্রতিমা নিরঞ্জন সম্পন্ন হয়।
বাংলা তথা দেশের উত্তর জনপদের অন্যতম প্রাচীন এই রাজবাড়ির দুর্গাপুজো কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং এটি আবহমানকালের ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অনন্য দলিল। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও বৈকুণ্ঠপুর রাজপরিবারের এই প্রাচীন রীতিনীতি ও জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন আজও টিকিয়ে রেখেছে উত্তরবঙ্গের সোনালী অতীত ও ঐতিহ্যকে, যা দেখতে প্রতিবছর হাজার হাজার দর্শনার্থী ভিড় জমান জলপাইগুড়িতে।
বাংলা নিউজ ২৪ জাতীয় সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুসারে বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর সংবাদ প্রকাশ করে। কোনো অসঙ্গতি বা তথ্য সংশোধনের জন্য আমাদের সম্পাদকীয় বিভাগের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ করা হচ্ছে।